1. newsroom@saradesh.net : News Room : News Room
  2. saradesh.net@gmail.com : saradesh :
মোহাম্মদ সোলায়মানের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে 'স্মৃতির পাতায় দক্ষিণ কোরিয়া' - সারাদেশ.নেট
রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:২৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
সরকারি খরচায় সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইডে ৩০৪৮ মামলায় আইনি সহায়তা শ্রম আইন প্র্যাকটিস এবং প্রাসঙ্গিক কথা : ড. উত্তম কুমার দাস, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করতে চায় রোমানিয়া কুমিল্লা সাংবাদিক ফোরাম, ঢাকা’র ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত বিচারপতি মোঃ আশফাকুল ইসলাম আপিল বিভাগে ভ্যাকেশন জাজ মনোনীত আপিল বিভাগের জেষ্ঠ্য বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কারামুক্ত হলেন আইনজীবীদের নেতা ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বেসিক প্রিন্সিপালস্ অফ ডেন্টাল ফার্ফাকোলজি এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ ‘ইতালিয়ান ভাষার’ ওপর পরীক্ষা উদ্বোধন করলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত ইতালিয়ান ভাষা শিক্ষাকোর্স ও পরীক্ষা কেন্দ্র উদ্বোধন বুধবার

মোহাম্মদ সোলায়মানের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘স্মৃতির পাতায় দক্ষিণ কোরিয়া’

  • Update Time : সোমবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২২

মোহাম্মদ সোলায়মান: সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি) প্রভাতি শাখা : গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা-

অবশেষে প্রতিক্ষার প্রহর শেষ হলো। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, রোজ শনিবার, দুপুর ১২ টায়, আমরা ২০ জন দক্ষিণ কোরিয়ায় কম্পিউটার বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণের উদ্দেশ্যে থাই এয়ারওয়েজে ওঠার বোর্ডিং পাস নিয়ে অপেক্ষমান।

ইতোপূর্বে সুবর্ণভূমি বিমানবন্দর নিয়ে পড়েছি ও শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছি। এক সময় ভাবতাম একবার যদি সুবর্ণভূমি দেখার সুযোগ পেতাম।

ঢাকা হতে যথারীতি ফ্লাইট ছাড়ল এবং যথাসময়ে আমরা সুব বিমানবন্দরটি বেশ বড়, অল এ্যারাইভাল পথ ধরে ভিতরে চারদিকে হাঁটলাম। বেশ সুন্দর থরে থরে সাজানো গোছানো, অত্যাধুনিক মনোহরী একটি বিমানবন্দর। সে দেশের জাতীয় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার স্পর্শ সর্বত্র বিদ্যমান। সত্যিই সুবর্ণভূমি নামকরণটি যথার্থ হয়েছে।

সুবর্ণভূমি সম্পর্কে আমার লালিত কৌতূহল বাস্তবে যখন অবলোকন করছি তখন আমি ভীষণরকম আনন্দিত।

সুবর্ণভূমিতে আমাদের সাড়ে পাচঁ ঘন্টার ট্রানজিট থাকবে, সেজন্যে সাথে কিছু থাই বাথ (থাইল্যান্ডের মুদ্রা) সাথে রাখি। সকল দেশে ডলার ব্যবহার করা গেলেও বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে সামান্য পরিমান লোকাল কারেন্সি সাথে রাখাটা বুদ্ধিমানের কাজ। ফুড কর্ণার হতে হালকা কিছু খেয়ে হাঁটার শক্তি সংগ্রহ করে নেই এবং যতটুকু সম্ভব দেখে নেই।

পুনরায় নির্ধারিত ফ্লাইটে যাত্রা শুরু এবারের গন্তব্য ইন্চিয়ন বিমানবন্দর, সিউলে অবস্থিত কোরিয়ার সবচেয়ে বড় আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর।

বিমানবন্দরের সকল কাজ শেষ করে আমরা সবাই বের হই। বের হয়েই দেখি, হাসিমুখে একজন প্রতিনিধি আমাদের জন্য অপেক্ষমান। তিনি তার ভাষায় আমাদের স্বাগত জানালেন। তিনি যা বললেন তা হচ্ছে,

”আন্না হাসিয়ো”- বুঝি আর না বুঝি আমরাও তাকে, তার ভাষায় বলে দিলাম ”আন্না হাসিয়ো”।

তিনি মাথা নিচু করে অভিবাদন জানালেন, আমরাও তার প্রতি একইভাবে সৌজন্য দেখালাম। আমাদেরকে একেটি সুন্দর বাসে ৩০ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত গিম্পু বিমানবন্দরে নিয়ে যান। যেতে যেতে তিনি সুন্দর সহজ প্রাঞ্জল ইংরেজিতে কোরিয়ার অতীত ও বর্তমান সম্পর্কে আমাদের যথেষ্ট ধারণা দিলেন। বাসটি সুন্দর সুপরিসর বিধায় আমরা সবাই জানালার পাশেই বসলাম। উদ্দেশ্য প্রথম দেখায় কোরিয়া কেমন লাগে, তা দেখা। বাসটি দ্রুত এগিয়ে চলছে সিউলে নতুন নির্মিত একটি নান্দনিক লিংক রোড দিয়ে। বামে উঁচু নিচু পাহাড়, ডানে ছবির মতো শান্ত নদী। আমার হাতের এ্যাপেল ঘড়িটিতে গতিবেগ দেখাচ্ছে ১১০ কিলোমিটার। কোরিয়ান এয়ারওয়েজে গিম্পু হতে গিমহে (বুশান) এয়ারপোর্ট যাওয়ার ইমিগ্রেশন করিয়ে, আমাদের কাছ থেকে তিনি বিদায় নিলেন । ভেবেছিলাম প্রথম দেখা এই বন্ধুটির সাথে আবার দেখা হবে, কিন্তু আর হলো না। ১ ঘন্টা ১৫ মিনিটি পর আমরা গিমহে বিমানবন্দরে পৌঁছাই। বিমানবন্দরের সকল কাজ শেষ করে বের হয়ে, আমাদের মূল টিম ম্যানেজার (কিম জিহায়ে) আমাদেরকে কোভিড টেষ্ট করাতে নিয়ে যান। ঐদেশে এ্যরাইভালদের জন্যে কোভিড টেস্ট বাধ্যতামূলক। আমরা সবাই টেস্ট দিয়ে বাসে উঠি। এবারের গন্ত্যব্য ড্যাগু শহর। সময় লাগলো ২ ঘন্টা।

বাংলাদেশ ও কোরিয়ার ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য: বাংলাদেশ ও কোরিয়ার মধ্যে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বেশ পার্থক্য বিদ্যমান। দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশ থেকে অনেক উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। বাংলাদেশের অবস্থান যেখানে ২০ থেকে ২৬ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে, সেখানে দক্ষিণ কোরিয়া ৩৩ থেকে ৩৯ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত। ফলে দুদেশের সময়ের ব্যবধান হচ্ছে ৩ ঘন্টা। রয়েছে আবহাওয়া ও জলবায়ুগত বেশ পার্থক্য রয়েছে। কোরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলেও আবহাওয়াগত পার্থক্য দেখা যায়। সেদেশে আমাদের দেশের মত ধীরে ধীরে ঋতু পরিবর্তন না। বরং অনেকটা রাতারাতি হয়ে যায়। কোরিয়ায় প্রধানত শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম ও শরৎ এ ৪টি ঋতু বিদ্যমান। ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি এই ৩ মাস শীতকাল। শীতকালে তাপমাত্রা মাইনাসে চলে যায় এবং মাঝে মাঝে ব্যাপক তুষারপাত হয়। কিন্তু দক্ষিণের অন্যতম পর্যটন নগরী বুসানে তুষারপাত খুব কম হয়। কোরিয়ায় মার্চ, এপ্রিল, মে এই ৩ মাস বসন্তকাল। এ সময় গড়পড়তা তাপমাত্রা থাকে ১০ থেকে ২০ ডিগ্রি। বসন্তকালেই, আমেরিকার ওয়াশিংটনের মত চেরি ফুল ফোটে ও মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায়। জুন, জুলাই ও আগস্ট গ্রীষ্মকাল এবং তাপমাত্রা থাকে ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি। এসময় বেশ বৃষ্টিপাত হয়। সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাস শরৎকাল। এ সময়ে তাপমাত্রা সাধারণত ১৫ থেকে ১৮ ডিগ্রি থাকে। বসন্ত ও শরৎকালকে কোরিয়া ভ্রমণের সেরা সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শরৎকালে গাছপালার উজ্জ্বল ও বর্ণিল পাতার সমারোহ দেখা যায়। আমাদের প্রশিক্ষণটা শরতের এমন একটা উপযুক্ত সময়েই পড়েছিল। সেদেশের ৭০ ভাগ ভূমি পাহাড়ি ও বাকি ৩০ ভাগ জায়গা মানুষের বসতি এবং কৃষি কাজে ব্যবহৃত। ঘুরতে গিয়ে ধানক্ষেত দেখতে পেলাম কৌতুহলবশে ধানক্ষেতের কাছে গিয়ে দেখলাম ধানগাছ গুলো ছোট, কিন্তু আমাদের দেশের চেয়ে তিন গুণ ফলন। আর আমরা যে ভাত খেয়েছিলাম তা ছিল কিছুটা আঁঠালো। অনেকটা বিন্নি চালের মতো। দলা দলা হওয়ায় কাঠি দিয়েও খাওয়া যায়। সেদেশে কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপক ভাবে তারা নিশ্চিত করতে পেরেছেন। শীতকালে তুষারপাত হওয়ায় ও বিরূপ আবহাওয়ার কারণে গ্রীন হাউজ এর ব্যবস্থা দেখতে পেলাম ।

ড্যাগু শহর:
পূর্বেই বলেছি আমাদের প্রশিক্ষণটি যে শহরে অনুষ্ঠিত হবে তার নাম ড্যাগু। শহরটি কোরিয়ার একটি অন্যতম একটি হাইটেক শহর। প্রকৃতি যেমন তাকে উজার করে, তার নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যকে ঢেলে দিয়েছে, সুন্দর মনের মানুষগুলোও তাদের সর্বোচ্চ ভালোবাসাটা দেখিয়েছে প্রকৃতির প্রতি। প্রকৃতি ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও রুচিশীল মানুষগুলো শহরটি গড়ে তুলেছে দৃষ্টিনন্দন করে। ড্যাগু শহর কোরিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম আধুনিক শহর ও প্রাচীন রাজধানী। একদিন আমরা সবাই মিলে অল্প দূরত্বে আকাশ রেলে/মনোরেলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লাভ করি। সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে পাতাল রেলে চলার অভিজ্ঞতা আমার আগে বেশ কয়েকবার হলেও আকাশ রেলের অভিজ্ঞতা এবারেই প্রথম। আশা করছি খুব শীঘ্রই ঢাকায় আমরা সেই সুযোগ প্রতিদিনই পাব। রেল হতে নেমে শেষ বিকেলের নিয়ন আলোয় লেকের পাড়ে সুন্দর সাজানো গুছানো সুসাং পার্ক ঘুরে দেখি। এই প্রথম কোরিয়াতে কাঁচা মেটো পথ ধরে হাটলাম। পায়ে ধূলোবালি লাগলেও অসুবিধা নাই, কারণ এক্সিট গেইটের কাছেই ধূলোবালি পরিষ্কার করার জন্যে উন্নতমানের আধুনিক বউলার মেশিনের সুব্যবস্থা করা আছে। কোথাও কোন ট্রাফিক পুলিশ/সাধারণ পুলিশ দেখতে পেলাম না। সেন্ট্রাল সিগন্যালিং এর মাধ্যমে ট্রাফিক কন্ট্রোল হচ্ছে। সব রাস্তা একমুখি, সাধারণ মানুষের/পথচারীর পারাপারের জন্যে সিগন্যাল ব্যবস্থা রয়েছে। রাস্তায় কোন গাড়ি নেই অথচ সিগন্যাল না থাকায় পথচারি রাস্তা পার হচ্ছেন না। একটা জাতি আইনের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল হতে পারেন, তা স্বচক্ষে না দেখলে, বুঝার উপায় নেই। এই কয়দিন আমি অনেক ঘুরেছি, গত ২/৩ বৎসর যাবত কোরিয়ার শিক্ষকদের সাথে অনলাইন ট্রেনিং এর কো-অরডিনেটর হিসেবে কাজ করায়, সেই সকল শিক্ষকরাও আমাকে প্রশিক্ষণ সময়ের বাইরে অনেক সময় দিয়েছেন। গভীররাত অবধি, আমাকে বিভিন্নস্থানে নিয়ে গিয়েছেন। দিনের ড্যাগুর চেয়ে রাতের ড্যাগু আরো অসাধারণ।
এই কয় দিনে শহরটির প্রতি কেমন যেন একটু অন্যরকম মুগ্ধতা অনুভব করছি, যা আমার ভাষার দীনতায়, আমি তার যথার্থ বর্ণনা দিতে ব্যর্থ। অনেক ছবি তুলেছি, সংখ্যায় এ কয়দিনে প্রায় সাত হাজারের উপরে (আনা-দুল-ছেত অর্থাৎ এক-দুই-তিন)। সরাসরি দিনে রাতে যে সৌন্দর্য অবলোকন করার সুযোগ হয়েছে, তা রেখেছি মনের দিপালীতে, সে স্মৃতি হয়ত আমাকে ব্যাকুল করে তুলবে, কখনো হয়ত জীবন দিগন্তকে ছাড়িয়ে যাবে।

কোরিয়ায় আবাসিক হোটেল অভিজ্ঞতা:
এত পথ যাত্রা করে মোটামুটি ভাবে আমরা সবাই ক্লান্ত। কিন্তু বাস হতে কোরিয়ার অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে সকল ক্লান্তি ভুলে যাই। সন্ধ্যায় আমরা হোটেল লাউন্জিনায় (৫ তারকা হোটেল) পৌঁছাই। পৌঁছে দেখি আমাদের টিম ম্যানেজমেন্টে ০২ জন প্রতিনিধি আমাদের অপেক্ষায়। রুমের বরাদ্দপত্র ও রুমের এ্যাকসেস কার্ড (চাবির বিকল্প) নিয়ে দাঁড়ানো। আমাদেরকে আমাদের রুম বুঝিয়ে দিয়ে, ঐদিন কার মতো কর্তৃপক্ষ বিদায় নিলেন। আমার রুম নম্বর ১২১৫ অর্থাৎ ১২ তলায়। আমরা কয়েকজন লিফটের ভিতরে কেউ কেউ কাক্ষিত বাটনে চাপ দিচ্ছেন, কিন্তু লিফট কল নিচ্ছে না। আমি একটু ভিতরে/পিছনে দাড়িয়েছিলাম, আমি আমার এ্যাকসেস কার্ডটি সেন্সর প্লেসে রেখে বাটন চাপলাম, লিফট চলা শুরু করল। আমি বিষয়টি জানতাম কারণ আমেরিকাতেও এই ব্যবস্থা দেখেছি। ইতোমধ্যে আমাদের অন্যান্য সবাই বুঝে গেলেন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে।

আমাদের হোটেলটি ড্যাগু শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। আমাদের হাতে দেয়া সেই এ্যাকসেস কার্ডটিতে একটি চিপ বসানো আছে। কার্ডটি ছাড়া রুমে যাওয়া যাবে না, রুমে একটি নির্দিষ্ট হোল্ডারের না রাখলে রুমে বিদ্যুৎ সঞ্চালন বন্ধ থাকবে। করোনা পরিস্থিতির কারনে হোটেলে কোন রুম সার্ভিস নেই। সব কিছুই সেল্ফ সার্ভিস। এবার একটু বাথরুম নিয়ে বলা যাক, সুন্দর সাজানো গোছানো অত্যাধুনিক সবকিছুই আছে। শুধু পরিচিত অতিপ্রয়োজনীয় ও বহুল ব্যবহৃত একটি বিশেষ সামগ্রী অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও পাওয়ার মতো কোন ক্লো খুঁজে পেলাম না। অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতির পরেও, তাদের অতীতকে তারা ভুলতে পারেন নি। অবশ্য বিশ্বের অনেক দেশেই এই ব্যবস্থা রয়েছে। সুন্দর, সুপরিসর কমোডটিতে কোন ধরনের ফ্লাস বাটন নেই। কমোডটিতে সেন্সর বসানো। অটো ফ্লাশ হয়, আর্জেন্ট ফ্লাসের জন্য ডানপাশে হাতলের মত একটি অংশ আছে, যার মধ্যে সেন্সর প্লেট এবং দেয়ালে কমোডরে জন্য টেলিভিশানের রিমোটের মত একটি রিমোট কন্ট্রোল বসানো। চিহ্নিত করা প্রতীকের পাশে কোরিয়ান ভাষায় তার বর্ণনা দেয়া আছে। গুগোল লেন্স ব্যবহার করে যে কোন ভাষায় ভাষান্তর করে সহজেই বুঝে নেয়া যায়। যাহোক, এই অংশটুকু বাদ দিলে রুমের ভিতরে আধুনিক সকল সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে। দেশটি স্বাধীন হয়েছে মাত্র ৬০ বৎসর। এই ৬০ বছরের মধ্যেই তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার বাথরুম পর্যন্ত এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। হোটেলটি বেশ অত্যাধুনিক, সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধায় ভরপুর স্বচ্ছ কাঁচের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে উপরের খোলা আকাশ ও উঁচু দালানের মাঝ দিয়ে দূর পাহাড়ের উজ্জ্বল সবুজ দৃশ্য সত্যি উপভোগ করার মতো।

কোরিয়ায় খাদ্য বিড়ম্বনা:
রুমে পৌঁছার পর যথারীতি পরিপাকতন্ত্রের অনাহারী তীব্রযন্ত্রণা ভীষণভাবে উপলব্ধি হলো। অবশেষে দীপ্ত বিশ্বাস রাতের খাবার নিয়ে এলো। খাবার পেয়ে আমি বেজায় খুশি, খাবারের নাম বিমভাপ/কিমভাপ। ভাত ও অর্ধসিদ্ধ সবজি ও ডিম আমাদের দেশীয় শর্মার আদলে সাদাকালো কাগজে মোড়ানো স্লাইস করে কাটা এক বিশেষ খাবার। প্রচন্ড ক্ষুধার মধ্যে এতোটুকু টের পেতে সমস্যা হয়নি যে, যাপিত জীবনে এমন স্বাদহীন খাবারের সাক্ষাৎ আর ঘটেনি। অবশ্য সে দেশে যাবার পূর্বে সে দেশ সম্পর্কে সহকর্মী জনাব শিমুল বিল্লাহ আপার কাছ থেকে বিস্তর ধারনা পেয়েছিলাম এবং আমি কিছুটা প্রস্তুতও ছিলাম। হোটেলের ৬ ও ৮ তলায় ক্যান্টিনের ব্যবস্থা ছিল, আমরা সকালের নাস্তাটি হোটেলের ক্যান্টিনেই করতাম। বুফে সিস্টেম, প্রচূর খাবারের আয়োজন ছিল। কিন্তু প্রায় সকল খাবারে পর্ক বা তার চর্বির কমন ব্যবহারের কারণে মাংসকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করতে হলো। ছিল শামুক,ঝিনুক,সাপ, ব্যাঙ, কেঁচো, অক্টোপাস সহ অনেক ধরণের রুচিহীন খাবারের মহা আয়োজন।

ক্যান্টিনে ঢুকলেই আমার Samuel Taylor Coleridge’s এর বিখ্যাত লাইন ’Water, water everywhere and not a drop to drink টি মনে পরতো। পর্যাপ্ত সংখ্যক সিদ্ধ, অর্ধসিদ্ধ শাকসবজি, কাঁচা মাছ, ফ্রাইকরা মাছ, ফল, ফলের জুস, মিষ্টি, সস, সালাদ ইত্যাদির আয়োজন থাকায় মাছ, ফল ও মিষ্টিকেই মেনু হিসেবে বাছাই করেছিলাম তবে সামুদ্রিক মাছ পেলে কোন ছাড় হবে না তাহা আগেই ঘোষণা দিয়েছিলাম। মূলত ফ্রাইকরা মাছই ছিল আমার প্রধান আইটেম। সাথে কিছু ভাত, সবজি, সালাদ আর খাবারের হাতিয়ার হিসেবে যথারীতি দুইখানা কাঠি ও একখানা করে চামচ ও ছুরি। স্বাদ বা গন্ধ উভয়ই ছিল বেশ মন্দ, শুধু প্রয়োজনীয় ক্যালরী পুরণে জোরজবরদস্তি করে পেটে চালান করে দিতাম।

উল্লেখ্য কোরিয়ানরা বাসায় রান্না করেন না। যেহেতু সবাই জব করেন, তাই তারা হয় হোটেলে গিয়ে খায় অথবা হোটেল হতে খাবার আনিয়ে নেয়। যেমন আমাদের দেশের ফুড পান্ডার মতো। অবশ্য হোটেলের খাবারের মান উন্নত, কোন প্রকার ভেজাল তারা বুঝেন না, কোন ভেজাল নেই। তাদের কাছ হতে জানতে পারলাম যে, হোটেলে খেলে তাদের সময় ও টাকা দুটোরই সাশ্রয় হয়। তারা সকালের নাস্তা ৭ থেকে ৮ টার মধ্যে, দুপুরের ১২ থেকে ১ টার মধ্যে এবং রাতের খাবার সন্ধ্যা ৬ টা থেকে ৭টার মধ্যে খায়। আমাদেরকে এই রুটিন মানতে হলো।

প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা:
আমাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনার সাথে ড্যাগু শিক্ষা বিভাগের পাঁচ জন সুহৃদ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (Kim Jihae, Lim Jonghawn, Han Seokmin, Choi Keong Dong, Yu Donguk) জড়িত ছিলেন। যারা প্রতিদিন সকাল ৭.৩০ এর মধ্যে হোটেলে হাজির হতেন এবং ডিনার শেষে আমাদেরকে হোটেলে পৌঁছিয়ে দিয়ে রাতে চলে যেতেন। তারা সার্বক্ষণিক আমাদের যে কোনো সমস্যা, সুবিধা-অসুবিধার প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন এবং সমাধান করতেন। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, তারা তাদের মাতৃভাষা ব্যতিত অন্য কোন ভাষা ব্যবহার করেন না, জানার প্রয়োজনও বোধ করেন না। কোথাও তাদেরকে ইংরেজির ব্যবহার করতে দেখি নি। Elementery School হতে শিক্ষার মাধ্যম, প্রযুক্তি, প্রোগ্রামিং সর্বক্ষেত্রেই তাদের মাতৃভাষার ব্যবহার। তাই আমাদের সাথে সার্বক্ষণিকভাবে ইন্টারপ্রেটার বা দোভাষী হিসেবে কাজ করেছেন বাংলাদেশের বন্ধুবর গোলাম রব্বানী ও দীপ্ত বিশ্বাস। যারা দু’জনেই সেদেশে পিএইচডি করছেন এবং ৫/৭ বছর ধরে সেখানে আছেন। উভয়েই তাদের আন্তরিকতার সবটুকুন ঢেলে দিয়ে আমাদেরকে সহযোগিতা করেছেন। সকাল ৯ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত আমাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলত। বিশেষ লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো যে, আমাদের কোনো প্রশিক্ষকই দেরিতে আসতেন না। আমরা পৌঁছার পূর্বেই দেখি শিক্ষক উপস্থিত। একজন শিক্ষক আমাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতেন এবং তাকে সহযোগিতা করার জন্য আরো দুই জন সহযোগী শিক্ষক ছিলেন, যারা আমাদেরকে বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ পৌঁছে দিতেন। ব্রেইন যেন ভালো কাজ করে সেজন্যে প্রতি ৫০ মিনিট পরপর ১০ মিনিটের একটি ব্রেক / বিরতি দেওয়া হতো। বাহিরে আমাদের জন্য কফি, পানি ও বিস্কুটের ব্যবস্থা ছিল । এই সময়ে আমরা একটু বাইরে গিয়ে কফি খেয়ে বা রেষ্ট নিয়ে পুনরায় শ্রেণিকক্ষে ফেরত আসতাম।

শ্রেণি কার্যক্রমে পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ যেমন: ল্যাপটপ, ট্যাব, রোবট, ড্রোন ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে। শিক্ষকরা ছিলেন খুবই মিশুক ও প্রাণবন্ত। অপরিস্কার বা বিশৃঙ্খলা এদেশীয়দের কাজে লক্ষ্য করা যায়নি। আমরা প্রথম দিকে শ্রেণিকক্ষে কাগজ, পানির বোতল বা টিস্যু এখানে সেখানে ফেলতাম। ক্লাসের চেয়ার-টেবিল এলোমেলো রেখেই চলে আসতাম। এই কয়দিন তাদের সাথে থাকতে থাকতে আমাদের মধ্যেও শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতাবোধ তৈরি হয়েছে। ঐযে কথায় আছে ‘সৎ সঙ্গে সর্গ বাস’।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন:
১২ টা থেকে ১ টার মধ্যে দুপুরের খাবার ও নামাজ শেষে, আমাদেরকে নিয়ে যাত্রা শুরু হতো বিভিন্ন স্কুল, মিউজিয়াম ও দর্শনীয় স্থানে। এগুলো পূর্ব নির্ধারিত ছিল এবং প্রশিক্ষণের একটি মূল্যবান অংশ হিসেবেই আমি মূল্যায়ন করি । আমাদের প্রশিক্ষণটি আইসিটি শিরোনামে হলেও এটির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, সে দেশের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। পাশাপাশি তাদের ঐতিহ্যবাহী অনেক স্থানে আমাদেরকে নিয়ে গেছেন, যেখানে সাধারণ মানুষের একসেস থাকে না। আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, হাইস্কুল, ভোকেশনাল স্কুল, অত্যাধুনিক অটোমেটেড হাইস্কুল ও আমাদের আগ্রহে ড্যাগুর অন্যতম Kyungpook National University (KNU) বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেছি, সেখানে গিয়েও ৩ জন পিএইচডি অধ্যয়নরত বাংলাদেশীর সাক্ষাত পাই।

আমরা একদিন একে একে একটা কিন্ডারগার্টেন কাম ট্রেনিং সেন্টার ও একটা ভোকেশনাল স্কুল পরিদর্শন করলাম। কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষার্থীদের প্রাকটিক্যাল বেজড পাঠদান কাম শিক্ষাদান পদ্ধতি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। এ স্কুলে শিক্ষাথীদের, শিক্ষকদের,এমন কি অভিভাবকদেরকেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এখানে আনন্দের সাথে শেখানো হয় এবং পুস্তকীয় জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিত্তিক নানা দিক, হাতে কলমে শেখানো হয়। মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা লাভের জন্য ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হয়, খেলাধুলা শেখানো হয় ইত্যাদি। যেমন: একটা প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চারাও জানে পাসপোর্ট কি? বিমান কি? পাইলট কি করেন? ডাক্তার কি করেন? বলতে গেলে Little stepping to lead the future. আর সবই হচ্ছে শুধুমাত্র তাদের মাতৃভাষার মাধ্যমে।

ভোকেশনাল শিক্ষা বলতে আমাদের দেশে, আমরা শুধু কারিগরি শিক্ষাকেই মূলত বুঝে থাকি। কিন্তু এদেশের ভোকেশনাল স্কুলে গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে, বেকারি, স্পা, হেয়ার ড্রেসার, কারিগরি,সঙ্গীত, বিনোদন এভাবে দৈনন্দিন জীবনের বহু অপরিহার্য বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে, শিক্ষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রদান করার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা হয়। আমাদেরকে এ স্কুলের শিক্ষার্থীদের তৈরি কেক, পাউরুটি দিয়ে আপ্যায়ন করানো হয়। বহু কিছুর মধ্যে নেইল পলিশিং এর প্রশিক্ষণেরও একটা কক্ষ ও তার ভিতরে নানা আয়োজন দেখলাম। সবগুলো স্কুলের কর্তৃপক্ষই আমাদেরকে সাদরে গ্রহণ করেছেন, তাদের বিদ্যালয়ের সকল কার্যাবলী দেখালেন এবং গিফট দিলেন। প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ হতে আমাদেরকে যে আন্তরিকতা, আতিথেয়তা, সহযোগিতা ও ভালোবাসা দেখানো হয়েছে তা সত্তিই কল্পনাতীত। বন্ধুপ্রতীম একটা দেশের রাষ্ট্রীয় মেহমান হিসেবেই আমাদেরকে তারা ট্রিট করেছেন।

শিক্ষার্থীদের সাথে কোরাস গানে গলা মেলালম, নাচলাম, সেল্ফী নিলাম। ওরাও প্রচন্ড খুশী হয়েছে, সুযোগ পেয়ে ওদের কে দিয়েও বাংলা ভাষায় বলালাম-’আমরা বাংলাদেশকে ভালোবাসি’। স্কুল কর্তৃপক্ষের অভাবনীয় আন্তরিকতা, সহযোগিতায় আমরা সবাই মুগ্ধ। স্কুলের চমৎকার পরিবেশ, শিক্ষাক্ষেত্রে নানা টুলসের প্রাকটিক্যাল ব্যবহার, শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ববোধ, জীবনমুখী ও বাস্তবানুগ শিক্ষা ব্যবস্থার নানা দিক সম্পর্কে অবহিত হলাম। কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে, তাদের শিক্ষার্থীদের সাথে মেশার সুযোগ করে দিলেন। সবশেষে সবাইকে উপহারও দিলেন। এখানে ছবি দিতে পারছি না, তবে মনের গহীনে যেসব ছবি আপলোড করেছি তার ছাপ কিছু হলেও অবধারিতভাবে আমার শিক্ষার্থীদের উপর প্রভাব ফেলবে।

প্রশিক্ষণের অভিষেক ও সমাপনী:
১৮.০৯.২০২ হতে যথারীতি আমাদের প্রশিক্ষণটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এবং সন্ধ্যায় হোটেলের কন্ফারেন্স রুম আমাদের সৌজন্যে রিসিপশন ডিনারের আয়োজন করা হয়। প্রশিক্ষণের সাথে কোরিয়ার শিক্ষা বিভাগ ও প্রযুক্তি বিষয়ক বিভাগের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিগণ স্বাগত বক্তব্য দেন। বিদেশের মাটিতে একটি ঝমকালো আয়োজনের মাধ্যমে তারা আমাদেরকে সন্মান দেখালেন। ২৬.০৯.২০২২ তারিখে আমাদের প্রশিক্ষণের শ্রেণি কার্যক্রমের পরিসমাপ্তি ঘটলো। সকল বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সকল শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট সকলের উপস্থিতিতে দুই দেশের হেড অব টিম, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। তারপর IACE এর চেয়ারম্যান (Kang Eun hee) মহোদয়, আমাদেরকে প্রশিক্ষণ সমাপনীর সনদ প্রদান করেন ও ফটোসেশন করেন। দুটো অনুষ্ঠানেই একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় ছিল যে, সেখানে আমাদের দেশের মত বিশেষ মঞ্চ, ব্যানার, ব্যানারে পদবীসহ অতিথির নাম, মঞ্চে বসার বাহারি চেয়ারের কোন কিছুই ছিল না। সবাই দর্শকদের /উপস্থিত সভাসদের সাথেই বসা ছিলেন। ঘোষকের ঘোষণা মোতাবেক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই পোডিয়ামে যান ও বক্তব্য প্রদান করেন। বক্তব্যের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিশেষণের বিন্দুমাত্র ব্যবহার নেই, যতটুকুন না বললেই নয়, ঠিক ততটুকুই। কথার ফুলঝুড়িতে কাউকে খুশি করার নূন্যতম চেষ্টাও তাদের নেই।

কোরিয়ায় প্রাপ্ত উপহার সামগ্রী:
আমরা যে সকল প্রতিষ্ঠানে গিয়েছি সকল প্রতিষ্ঠান প্রধানই আমাদেরকে রিসিভ করেন এবং কিছু না কিছু গিফট দিয়ে সম্মানিত করেছেন। আমাদের প্রাপ্ত উপহারসমূহের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কোরিয়ান সরকারের শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক Samsung ব্রান্ডের ল্যাপটপ, যা আমাদের দৈনন্দিন প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষাদান কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করবে । এছাড়া আরো অনেক উপহার রয়েছে। যেমন: ছাতা, টাওয়েল, হাতপাখা, ছোটো ব্যাগ, ফ্লাস্ক, মগ, পেন ড্রাইভ, স্মার্ট চার্জার, ফাইল, নোটবুক, কলমসহ বক্স, বিভিন্ন রকমের পেনসিলসহ বক্স, মোজা, মাস্ক বক্স, কফি বক্স, বিভিন্ন রকমের মিষ্টি, কেক, বিস্কুট ইত্যাদি। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের শিক্ষকরাও আমাদেরকে কিছু না কিছু উপহার দিতেন। একেবারে শৈশবের স্মৃতিতে পৌছে যেতাম। এমন সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল, সভ্য ও উন্নত একটি দেশ দেখার সুযোগ করে দেওয়াটা ছিল, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় উপহার। বাংলাদেশ ও কোরিয়া উভয় সরকারের প্রতি ও সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি অহর্নিশ কৃতজ্ঞতায় চির ঋণাবদ্ধ।

কোরিয়ায় ‘ইয়াং ওয়ান’ কোম্পানির ফ্যাক্টরি পরিদর্শন:
KEPZ নামে চট্টগ্রামে অবস্থিত, বাংলাদেশের প্রথম ও সবচেয়ে বড় বেসরকারি EPZ এর নাম আমরা শুনেছি। শ্রমিক বান্ধব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এই EPZ টি কোরিয়ান ‘ইয়াংওয়ান’ কোম্পানি কর্তৃক পরিচালিত। বিশ্বখ্যাত The North Face ব্র্যান্ড তাদেরই। পৃথিবীর কয়েকটি দেশে তাদের ফ্যাক্টরি রয়েছে। কোরিয়ার ড্যাগুতে অবস্থিত মূল ফ্যাক্টরিটি আমাদেরকে দেখানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। এখানে ২০ বছর ধরে কর্মরত দুজন বাঙালি কর্মকর্তা আমাদেরকে সহযোগিতা করেন। প্রথমে আমাদেরকে পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে কোম্পানীর ইতিহাস, কোম্পানীর কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রতি প্রতিষ্ঠাতার নিখাদ ভালোবাসা ইত্যাদি প্রদর্শন ও আলোকপাত করা হয়। তারপর ফ্যাক্টরীটি ঘুরিয়ে দেখানো হয়। সবশেষে আমাদেরকে এই ফ্যাক্টরিতেই উৎপাদিত জিনিসপত্র উপহার হিসেবে দেওয়া হয়।

কোরিয়ায় জুম্মার নামাজ আদায়:
আমাদের ২০ জনের টিমের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নামাজি বান্দা। ট্রেনিং সেন্টারে আমরা একটা ক্লাস রুমের ফ্লোর টিস্যু দিয়ে মুছে জোহরের নামাজ আদায় করতাম। বিষয়টা দেখার পর কর্তৃপক্ষ আমাদের জন্য ফ্লোর ম্যাটের ব্যবস্থা করেছিলেন। ২৩.০৯.২০২২ ছিল শুক্রবার । জুমার নামাজ আদায়ের বিষয়টি তা কর্তৃপক্ষকে জানালে আমাদেরকে ডেগুর একটি মসজিদে নিয়ে যান। মসজিদটির নাম হযরত ওমসান ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার। আমরা এ মসজিদে দুজন বাঙালি ভাইয়ের সাক্ষাত পাই। তাদের থেকে জানলাম যে, বিভাগীয় পর্যায়ের এই শহরটিতে মুসলমানদের সংখ্যা ১% এর কম। এখানে ২/৩ টি মসজিদ রয়েছে। এই মসজিদটি পাকিস্তানিদের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। এখানে মুসুল্লিদের মধ্যেও পাকিস্তানিরা বেশি, তারপরে উজবেক। ২/৪ জন বাঙালিও আছে।

কোরিয়ায় বিজ্ঞান ও শিক্ষা জাদুঘর পরিদর্শন:
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরে তাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ক্রমোন্নতির ধারাবাহিক প্রদর্শন করা হয়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এ ধরনের জাদুঘর ভ্রমণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এদেশের জাদুঘরকে প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবেই ব্যবহার করা হয়। শিক্ষার্থীরা এখানে হাতেকলমে জ্ঞানার্জন করে। আমরা ২৩.০৯.২০২২ তারিখ কোরিয়ার ড্যাগু শহরের সাংইয়ুকে অবস্থিত প্রায় পাঁচশ বছরের প্রাচীন বিদ্যালয় দেখতে যাই এবং তৎসময়ের শিক্ষার্থীদের পোষাক হাঙ্গুল পরিধান করে গুরুর শিক্ষা গ্রহণ করি, গুরুর নির্দেশনানুযায়ী বাদাম পেস্ট দিয়ে মাছ, ফুল ডিজাইনের সন্দেশ তৈরি, রোদে শুকানো তুলশী জাতীয় পাতা দিয়ে চা তৈরি করে খাওয়া ও তীর চালনা বিদ্যা অর্জন করি। কৃতিত্বের স্বাক্ষর হিসেবে আমাদেরকে তাদের ভাষায় লিখিত সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়।

দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ:
অপরুপ প্রকৃতির অনিন্দ্য সমারোহ কোরিয়ার ডংহওয়াসার বৌদ্ধ মন্দির দর্শনে যাই। সেখান হতে ড্যাগু ফায়ার সেইফটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে, অগ্নিনির্বাপকের উপর প্রশিক্ষণ নেই। সেখান হতে আমরা যাই পালগংসান ক্যাবল কার ষ্টেশানে। তারপর সেখান হতে ক্যাবল কারে চড়ে ৮২০ মিটার (প্রায় ২৬৯১ ফিট ) উপর থেকে নিচের পাহাড় ও প্রকৃতির স্নিগ্ধতা উপভোগ করি। আমরা একদিন কোরিয়ার গুয়েনজু সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, বৌদ্ধ মন্দির ও প্রাচীন রাজধানী দর্শন করি। ২৭.০৯.২০২২ তারিখে আমরা রোবো লাইফ মিউজিয়ামে বেড়াতে যাই। সেখান হতে পোহাং (Pohang) সমুদ্র সৈকত (আমাদের কুয়াকাটা)। এখান হতে শুধু সূর্যোদয় দেখা যায়। এখান থেকে জাপান অনেকটাই কাছে।

বুসান সমুদ্র সৈকত:
আজ ২৮.০৯.২০২২ কোরিয়ায় ১১তম দিন। বুসান একটি অপরূপ সমুদ্র সৈকত। কোরিয়া ভ্রমণের একটি উল্লেখ স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হলো বুশানের ভূগর্ভস্থ SEA LIFE একুরিয়াম দর্শন। সমুদ্র তলদেশের বৈচিত্রময় অসংখ্য প্রাণিজগতকে দেখার অসম্ভব শিক্ষণীয় একটি আয়োজন (আলহামদুলিল্লাহ)। এক কথায় অসাধারণ!!! এখান থেকে জাপান খুব কাছে। বুসান সমুদ্র সৈকতটি অনেকটা মিয়ামী বিচের আদলেই তারা গড়ে তুলেছেন। আজ বুসানের একটি রেস্তোরায় লাঞ্চ করলাম, অসাধারণ ছিল এখানকার খাবার। সমুদ্র তীরের অপর পারেই জাপান। স্পীডবোটে করে না কি যাওয়া যায়। জাপানের কতটা কাছে এসে গেলাম, তবে এবার যাচ্ছি না। হয়ত একদিন আবার সুযোগ হবে। আপাদত আজ রাতেই দেশেই ফিরে আসছি ইনশাআল্লাহ। আমরা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম।

বিদায় পর্ব:
John Denver এর গানটি সকাল হতেই মনে উকি দিচ্ছে – – – Country roads, take me home, To the place I belong
হ্যাঁ, ইতোমধ্যে আমরা পৌছে গেলাম গিমহে বিমানবন্দরে। বিমানবন্দরে পৌছার পর, আমাদের হাতে আমাদের পাসপোর্ট ও টিকেট ফেরত দেন। নিরাপত্তার জন্যেই প্রথমদিন আমাদের কাছ হতে পাসপোর্ট টিকেট নিয়ে গেছেন। ঘড়ির কাটায় স্থানীয় সময় ৩:৫০ মিনিট। গিমহে বিমান বন্দরের সকল কাজ শেষ করে, আমাদের এই কয়দিনে অভিভাবক বন্ধুগণ বিদায় নেন। এই কয়টা দিনে সুন্দর মানুষগুলো আমাদের সাথে খুব মিশে গিয়েছিলেন। বিদায় বেলায় আমাদের সবার মন কিছুটা হলেও ভাড়াক্রান্ত হয়েছিল। যাই হোক একে একে বিদায় ক্ষণে স্মৃতি হিসেবে কিছু ছবি তুলি আর বলি …

কত্তো স্মৃতি, কত্তো কাজ,
মনের বিরুদ্ধে বিদায় নিচ্ছি আজ।
ভালো থেকো কোরীয় বন্ধুরা,
মুক্ত রেখো আমাদের এই আসা-যাওয়া।
আমরাই গড়বো আগামীর সুন্দর বসুন্ধরা।

পরিশেষে, আমরা একে অপরকে হামসামম্মিদা বলে ইমিগ্রেশানের দিকে এগিয়ে যাই। ধীরে ধীরে কোরীয় বন্ধুরা ও আমরা হাজারো স্মৃতির এ্যালবাম মনে নিয়ে, একে অপরের দৃষ্টির বাইরে চলে গেলাম।

বিমান বিলাস:
যাওয়ার সময় আমরা থাই এয়ারওয়েজে ও কোরিয়ান এয়ারের সুপরিসর বিমানে ভ্রমণের সুযোগ পাই। পরিবেশিত খাবার, বিমানের মান ও হোস্টজেদের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। ফিরতি বিমান ছিল পুরো উল্টো। শ্রীলংকান এয়ারলাইন্স। আমাদের ফিরতি যাত্রাতেও ট্রানজিট ছিল। আমরা ২৮ সেপ্টেম্বর তারিখ রাত ১১.২৫ টায় ইনচিয়ন বিমানবন্দর থেকে শ্রীলঙ্কান এয়ারে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করলাম। কলোম্বোতে কয়েক ঘণ্টার যাত্রা বিরতি। প্রায় ৫০০ যাত্রী বহনকারী বিমানের অবস্থা কিছুটা লক্কড়-ঝক্কড় মনে হলো। বিশেষভাবে সিট বাড়ানো হয়েছে। খুব ন্যারো ওয়াকিং ওয়ে, কনজাস্টডে সিট। অপরিচ্ছন্নতার কোন অভাব ছিল না। এক কথায় লোকাল বাস।

আমি অবশ্য পরে তিনটি খালি সীট দখল করে, অনেকটা ঘুমিয়েই কলম্বো পৌছাই। ঘুমানোর আগে একজন কেবিন এ্যাটেন্ডেটের সাথে, তাদের চাকুরি, দেশের অবস্থা নিয়ে কথা বলি। আমার IATA সম্পর্কীত জ্ঞান আছে বলে, সেও তার চাপা কষ্ট শেয়ার করে। পরে সে আমাকে ঘুম হতে জাগিয়ে খাওয়া দাওয়ার প্রতি বেশ কেয়ার নেন। তবে বিমানে খাওয়া-দাওয়া ভালো দিয়েছে। খাবারগুলোতে দেশী খাবারের স্বাদ পাওয়া গেলো। তবে তাদের পরিবেশন ভালো লাগেনি।

৮ ঘন্টা ২০ মিনিট পর কলম্বো বিমানবন্দরে অবতরণ করি। বিমানবন্দরটা দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ডিজাস্টারের স্পস্ট ছাপ বহন করছে বলে মনে হলো। মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিকি Sky Team এর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে, লোকষ্ট ফ্লাইট শেয়ার করার মাধ্যমে বিমান খাতটাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে মাত্র। তবে আমার কাছে শ্রীলংকান পাইলটদের টেক অফ ও ল্যান্ডিং স্কীল অসাধারণ মনে হলো। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশ হতে বাংলাদেশে ফিরার প্রায় ৫০০ জন যাত্রী নিয়ে স্থানীয় সময় সকাল ৭:৪০ যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ টাইম সকাল ১১:৩০ বিমানটি ঢাকায় অবতরণ করল। বিমানবন্দর হতে আমার বন্ধু রশিদ সহ তিনজনকে নায়েমে যাওয়ার জন্যে উবার ঠিক করে দেই এবং সকলের কাছ হতে বিদায় নেই। আবার দেখা হবে বন্ধু —– সুমনের গানটি মনে হতে লাগলো।

ইতোমধ্যে আমাকে রিসিভ করতে আমার ছোট মামনি ও তাদের একমাত্র মা এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলেন। কতদিন পর আবার তাঁর কাছে ও তাদের মাঝে।
>কেমন আছো?
>ভালো! তোমরা কেমন আছো?
>আলহামদুলিল্লাহ। কেমন ছিলে?
>এখন ভালো আছি।

====ডিএএম//

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *