1. newsroom@saradesh.net : News Room : News Room
  2. saradesh.net@gmail.com : saradesh :
নির্মাণ শিল্পের পথিকৃৎ আবদুল মোনেমকে চোখের জলে স্মরণ - সারাদেশ.নেট
সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:০৫ পূর্বাহ্ন

নির্মাণ শিল্পের পথিকৃৎ আবদুল মোনেমকে চোখের জলে স্মরণ

  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০

দিদারুল আলম দিদার : ৩১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে ২০২০। বিষাক্ত একটা বছর শেষ হচ্ছে। পাওয়া না পাওয়ার হিসেব করতে বসে সকলেরই মনে হচ্ছে, প্রাপ্তিযোগ শূণ্য। হৃদয়ের ভাঁড়ার কেবল খালি হয়ে গিয়েছে, স্বজন হারিয়েছে কতজন। এই দশকের অন্যান্য বছরগুলিতে আমরা এভাবে হারাইনি প্রিয়জনদের। ফিরে দেখি তাঁদের, যাঁরা চলে গিয়েছেন অজানিতের অন্ধকারে-না ফেরার দেশে।

২০২০ সালে আমরা যাদের হারালাম তাদের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল মোনেম। যিনি প্রিয় স্বদেশ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো বিনির্মাণে ছিলেন পথিকৃৎ ।

দেশের সফল ব্যবসায়ী ও শিল্পদ্যোক্তা ছিলেন আবদুল মোনেম। তিনি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী আবদুল মোনেম লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা। আবদুল মোনেমের কর্মময় জীবনের শতভাগ সততা ও নিষ্ঠা যুগ যুগ ধরে অনুসরণীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করেন দেশের ব্যবসায়ী শিল্পপতি ও উদ্যোক্তাগন। দীর্ঘ কর্মজীবন সুনামের সঙ্গে অতিবাহিত করার নজির দেশের ইতিহাসে বিরল ।

আবদুল মোনেম ১৯৩৭ সালের ৫ জানুয়ারি বৃহত্তর কুমিল্লার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পেশায় তিনি ছিলেন একজন প্রকৌশলী। সন্তান-মাইনুদ্দিন মোনেম ও মহিউদ্দিন মোনেম এবং ফরহানা মোনেম । যারা পিতার সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে চলছেন আরো উজ্জ্বল আগামীর পথে।

কর্মজীবন:

তিনি ১৯৫৬ সালে আবদুল মোনেম লিমিটেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যবসায়ের যাত্রা শুরু করেন। আবদুল মোনেম গ্রুপের পথচলা শুরু হয় অবকাঠামো নির্মাণ কাজের মধ্য দিয়ে। পরবর্তীকালে তিনি খাদ্য, পানীয়, চিনি পরিশোধনাগার, জ্বালানি, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসায় সম্প্রসারিত করে। একে একে তিনি গড়ে তোলেন ইগলু আইসক্রিম, ম্যাংগো পাল্প প্রোসেসিং, ইগলু ফুডস, ড্যানিস বাংলা ইমালসন, ইগলু ডেইরি প্রোডাক্টস, সুগার রিফাইনারি, এম এনার্জি লিমিটেড, নোভাস ফার্মাসিউটিক্যালস, এএম আসফল্ট এ্যান্ড রেডিমিক্স লিমিটেড, এএম অটো ব্রিকস, এএম ব্র্যান অয়েল কোম্পানি, সিকিউরিটিজ ও ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড এবং এএম বেভারেজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান। এসকল প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি মানুষ কর্মরত আছেন।
আবদুল মোনেম গ্রুপের মালিকানাধীন আবদুল মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চল যাত্রা শুরু করে ২০১৫ সালে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়াতে দেশের দ্বিতীয় বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলেন তিনি। এএম বেভারেজ ইউনিটের অধীনে কোকাকোলা ব্রান্ডের কোকাকোলা, ফান্টা ও স্প্রাইট বোতলজাত করে আসছে আব্দুল মোনেম লিমিটেড।


সামাজিক কর্মকান্ড :

ব্যবসায়ের পাশাপাশি তিনি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সমাজের বিপদগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে গড়ে তোলেন আবদুল মোনেম ফাউন্ডেশন। উক্ত ফাউন্ডেশন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজেশ্বরে প্রায় ৫২ একর জমি দান করে যেখানে গড়ে তোলা হয়েছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বেশ কয়েকটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও এই ফাউন্ডেশন একটি এতিমখানা পরিচালনা ও সমস্ত খরচ বহন করে যেখানে প্রায় ৩ হাজার এতিম পড়াশোনা করে। দেশে বন্যা বা অন্য কোনও ধরনের বিপর্যয়ের সময় এই ফাউন্ডেশন ত্রাণ বিতরণ ও অন্যান্য সহযোগিতা প্রদান করে থাকে।

পুরস্কার ও সম্মাননা :

রাষ্ট্রপতি শিল্প উন্নয়ন পুরস্কার, ২০১৪ । বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা সিআইপি (শিল্প)-২০১৩,২০১৬; বিজনেস পারসন অফ দ্য ইয়ার ২০০৮, বাংলাদেশ।

জীবনালেখ্য :

কৈশোরোত্তীর্ণ এক তরুণ যখন এসএসসি পাসের সনদ নিয়ে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন তখন তার এই শহরে টিকে থাকায়ই ছিল সংগ্রামের। তখন তার হাতে ছিল গুটিকয়েক টাকা যা দিয়ে চলাই ছিল দায়। এক বুক আশা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি নির্মাণ ব্যবসা শুরু করা সেই ছেলেটিই পরবর্তীতে হয়ে উঠেছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী। ৮৩ বছর বয়সে যখন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী মোনেম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মোনেম, তখন তার ব্যবসার সাম্রাজ্য বিশাল। নিজের নামে গড়ে তোলা এই প্রতিষ্ঠানের ছাতার নিচে রয়েছে ডজনের বেশি কোম্পানি।

আবদুল মোনেম লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল মোনেম বাংলাদেশের নির্মাণ শিল্পের পথিকৃৎ। মোনেমকে ‘আপাদমস্তক একজন সফল ব্যবসায়ী যিনি কোনো রাজনীতি বা রাজনৈতিক দর্শনের সমর্থক ছিলেন না। সব সময় একটা কথা বলতেন, কীভাবে মানুষের কর্মসংস্থান করা যায়।’ দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তিনি অন্যতম পথিকৃৎ।

শুরুতে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ঠিকাদার হিসেবে কাজ শুরু করা আবদুল মোনেম পরে ১৯৫৬ সালে মাত্র ২০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেড গড়ে তোলেন। তিনি এই কোম্পানিকে দেশের অবকাঠামো নির্মাণ শিল্পের সামনের কাতারে নিয়ে আসেন। তার নিজের নামে গড়া এএমএল কন্সট্রাকশনস লিমিটেড হয়ে ওঠে দেশের অন্যতম ‘শীর্ষ কন্সট্রাকশনস ফার্ম’। ৬০ বছরের বেশি সময় কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘মার্কেট লিডার’ হিসেবে বিবেচিত এএমএল কন্সট্রাকশসের দেশের সবচেয়ে বড় ও চ্যালেঞ্জিং ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে ভূমিকা রয়েছে। সড়ক, সেতু, ফ্লাইওভারসহ দেশের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ কাজে যুক্ত এএমএল কন্সট্রাকশনস মেট্রো রেল প্রকল্প এবং পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পেও বিভিন্ন কাজে জড়িত। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেটের ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে নির্মাণেও ভূমিকা রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের।

শুধু ব্যবসায়ী নন, একজন ভালো ও আপাদমস্তক মানবিক জনদরদী দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে আবদুল মোনেম স্বীকৃত। ব্যবসায়ীরা বলেন, আবদুল মোনেম ব্যবসা-বানিজ্য-শিল্প উদ্যোক্তা জগতে অন্যতম শীর্ষ অভিভাবক ছিলেন। একজন বড় মাপের সুমানুষ ছিলেন তিনি। একজন ব্যবসায়ীর প্রকৃত গুণ যা থাকার তার সবই ছিল আবদুল মোনেমের মধ্যে। এখন তো হরহামেশাই দেখা যায়, ব্যবসায় একটু উঠতে না উঠতেই কোনো না কোনো দলের হয়ে এমপি হয়ে যাচ্ছেন, মন্ত্রী হয়ে যাচ্ছেন আবদুল মোনেম সাহেবের মধ্যে এরূপ কোনো ইচ্ছা কখনোই পরিলক্ষিত হয়নি। তার লক্ষ্য ছিল ব্যবসা-বানিজ্য-শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ার মধ্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেয়ার প্রাণান্তর চেষ্টা । তার সাফল্য থেকে উৎসাহ নিয়ে দেশে অনেকে সফল হচ্ছেন। রাষ্ট্রও অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

ক্রীড়ামোদী :
পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী হয়েও খেলাধুলায় দারুণ আগ্রহী ছিলেন আবদুল মোনেম। বাংলাদেশে ফুটবলের জোয়ারের সময় ঢাকার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন তিনি। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৪-৯৫ মৌসুম পর্যন্ত ঢাকার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ছিলেন মোনেম। তার সময়ে ফুটবল লিগে ১৯৮৬, ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালে হ্যাটট্রিক শিরোপা জেতে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি।

মৃত্যু ও দাফন:
৩১ মে ২০২০সালে এ কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব ইন্তেকাল করেন। নিজের প্রতিষ্ঠিত জামিয়াতুস সুন্নাহ মাদ্রাসার মাঠে তাঁর জানাজা শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিজের প্রতিষ্ঠিত মসজিদের দক্ষিণ দিকে মায়ের কবরের পাশে শায়িত হলেন দেশের সুপরিচিত শিল্পগোষ্ঠী আবদুল মোনেম লিমিটেডের (এএমএল) প্রতিষ্ঠাতা আবদুল মোনেম।

‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে’—এটাই অনিবার্য নিয়তি। বাস্তব পরিণতি। কেউ আগে, কেউ পরে—পার্থক্য এতটুকুই। একমাত্র মহান আল্লাহ ছাড়া কেউ চিরন্তন নয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন,‘যখন মানুষ মারা যায় তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। শুধু তিনটি আমলের ফায়দা ভোগ করে—সদকায়ে জারিয়া; এমন জ্ঞান, যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং ওই সুসন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে। ’

আবদুল মোনেম তার কর্মের মাঝে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন অনন্তকাল এবং তার সুসন্তান, দেশ মাতৃকা ও অগনিত মানুষের দোয়ায় পরম করুণাময় মহান সৃষ্টিকর্তা তাকে ভালো রাখবেন।

ডিএ/এসএস//

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *